বিশেষ প্রতিনিধি,

দৈনিক ভোলা টাইমস::  ভোলার বিভিন্ন চরে ঘূণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রায়ই মহিষের মৃত্যু হচ্ছে। যার কারণ পর্যাপ্ত উঁচু মাটির ‘কিল্লা’ অথবা নিরাপদ বাসস্থানের অভাব। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সরকারি হিসেবে জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে ৩ হাজার ৬৫৯টি মহিষ হারিয়ে গেছে। এছাড়া মৃত্যু হয়েছে ৯৭টি মহিষের।

দীর্ঘদিন ধরে আবাসস্থলের সঙ্কট ও পর্যাপ্ত কিল্লার অভাবে চরাঞ্চলের খামারিরা মহিষ পালনে নানা বাধার মুখে পড়ছেন। এই সমস্যার সমাধানে জেলার বিভিন্ন চরে মহিষের আধুনিক বাসস্থান অথবা মাটির উঁচু কিল্লা স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ভোলা সদরের চর চটকিমারায় একটি কিল্লা নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার পাশাপাশি আরো ৩টি কিল্লার কাজ চলছে।

সরেজমিনে ভোলা সদর উপজেলার বিচ্ছিন্ন চর চটকিমারা গিয়ে মহিষ খামারিদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের আওতায় চরটিতে সম্প্রতি নির্মাণ করা হয়েছে মহিষের আধুনিক বাসস্থান বা মাটির উঁচু ‘কিল্লা’। মহিষের আধুনিক কিল্লাটি ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস থেকে খামারিদের মহিষের নিরাপত্তা দেয়ার পাশাপাশি রাখালদের নিরাপত্তা দিতেও সক্ষম হয়।

বাংলাদেশে এই প্রথম নির্মিত আধুনিক কিল্লাটি ভূমি থেকে ৭ ফুট উচ্চতায় হওয়ায় বন্যার পানি কিল্লাটিতে প্রবেশ করতে পারেনি। এর ফলে খামারিদের মহিষ ছিল সম্পূর্ণ নিরাপদ।

কিল্লাটিতে রাখালদের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের পাশাপাশি গভীর নলকূপের সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়েলেট ও সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে কম্পোস্ট পিট।

প্রতিবছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পাশাপাশি বজ্রপাতে অনেক মহিষের মৃত্যু হয়। তাই আধুনিক এই কিল্লায় রয়েছে বজ্র নিরোধক দণ্ড। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ও পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ভোলা জেলায় মহিষের পরিবেশগত ও টেকসই উন্নয়নে সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্ট বাস্তবায়নে আধুনিক এ কিল্লাটি স্থাপনের কাজ করছে বেসরকারি এনজিও ‘গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা’ (জিজেইউএস)।

কথা হয় চর চটকিমারার মহিষ খামারী নাজিম উদ্দিন ও মো. আলা আমিনের সঙ্গে। তারা জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময় পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও তারা তাদের মহিষগুলো এই কিল্লায় নিরাপদে রাখতে পেরেছেন। কোনো মহিষ ভেসে যায়নি। পাশাপাশি তারাও এই কিল্লায় নিরাপদে আশ্রয় নিতে পেরেছিল। এর আগে বন্যায় মহিষ ভেসে গিয়ে তাদের অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়।

খামারি হানিফ হাওলাদার ও নুরুল ইসলাম জানান, এর আগে চরে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যকর টয়েলেটের ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু আধুনিক এই মহিষ কিল্লাটিতে এই সকল সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি। এই প্রোজেক্টে অন্তর্ভুক্ত খামারিদের পাশাপাশি অন্যান্য খামারিরাও বন্যার সময় তাদের মহিষগুলো কিল্লায় রাখতে পেরে দুশ্চিন্তামুক্ত ছিল।

বেসরকারি এনজিও গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন মহিন জানান, ভোলার ৭ উপজেলায় ছোট-বড় ৪৫টি চরে ৮৮ হাজার মহিষ পালন করা হয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে এসব মহিষ লালন-পালন করা হলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগে শত শত মহিষের মৃত্যু হয়। এতে করে লোকসান গুণতে হয় মালিকদের। এসব বিবেচনা করেই উপকূলীয় এলাকার মহিষ রক্ষায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় মহিষের পরিবেশগত ও টেকসই উন্নয়নে সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্টের আয়োতায় বাংলাদেশে এই প্রথম ভোলার সদর উপজেলার চর চটকিমারায় আধুনিক এই কিল্লাটি নির্মাণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, জেলা সদর ও চরফ্যাশন উপজেলায় আরো ৩টি আধুনিক কিল্লা স্থাপনের কাজ চলছে। তবে এর সুফল তৃনমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে বেসরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য, এসব কিল্লায় সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্ট (এসইপি) এর মাধ্যমে ভোলা জেলার সম্ভাবনাময় এই মহিষ খাতকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার এসইপি প্রকল্প ইতিমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

Leave a comment