দৈনিক ভোলা টাইমসঃ 

বিএনপি নির্বাচনে না থাকলেও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে জমে উঠেছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। দল মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের পাশাপাশি মেম্বার পদেও ভোটের লড়াই লড়ছেন ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রার্থী। এ চিত্র বরিশাল বিভাগের প্রায় সব ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি)। কোথাও কোথাও শক্ত অবস্থানের কারণে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। এদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ঠেকাতে সব রকম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কঠোর অবস্থানে গেছে বরিশাল আওয়ামী লীগ। শনিবার দল থেকে ১০ জন বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ১৯ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সোমবার বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ১৭৩টি ইউনিয়নে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

জানা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের পেছনে দলীয় এমপি থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সমর্থন রয়েছে। এ কারণে এমন পরিস্থিতির থাকায় সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ভোটের দিন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ থাকবে কিনা তাই নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অন্তত ডজনখানেক নৌকা প্রতীকের প্রার্থী। নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়া নিশ্চিত করতে দলীয় ফোরামসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের কেউ কেউ লিখিত আবেদন পর্যন্ত করেছেন। এদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের ঠেকাতে সব রকম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর কঠোর অবস্থানে গেছে বরিশাল আওয়ামী লীগ। শনিবার একদিনেই দল থেকে ১৯ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জনই বিদ্রোহী প্রার্থী। এ বহিষ্কারের তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস।

যেসব ইউপিতে নির্বাচন হচ্ছে সেগুলোর প্রায় সবকটিতেই রয়েছে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী। মেম্বার পদে দলীয় মনোনয়ন বা প্রতীকের কোনো বিষয় না থাকায় চলছে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর ছড়াছড়ি। ৮০টিরও বেশি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে এক বা একধিক প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে নেপথ্য শক্তির দাপটে বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। এরকমই একটি ইউনিয়ন বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা পাতাকাটা। এখানে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগের জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভাই মোশাররফ হোসেন। প্রকাশ্যে নির্বাচনি মাঠে না এলেও নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী ভাইকে সবরকম শক্তি আর সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বরগুনা জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। সেখানে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মজিবুল হক কিসলু বলেন, দফায় দফায় হামলা হয়েছে আমার নেতাকর্মীর ওপর। এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে আহত করা হয়েছে। জেলা চেয়ারম্যানের ভাই ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর হুমকির মুখে ঘর থেকে বেরোতেই ভয় পাচ্ছে নৌকার কর্মী-সমর্থকরা। এমনকি প্রশাসনও এখানে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। তিনি বলেন, এ অবস্থায় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কিনা তাই নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কায় আছি। প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকলে নৌকার জয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিদ্রোহী প্রার্থী মোশাররফ হোসেন বলেন, পরাজয় নিশ্চিত জেনে এসব মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। ভোটাররা সবাই আমার পক্ষে। সুষ্ঠু ভোট হলে আমিই জিতব।

আরও কয়েকজন নৌকার প্রার্থী শঙ্কায় রয়েছেন। বরগুনার বামনা উপজেলার ঢৌয়াতলা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের প্রার্থী কামরুল ইসলাম নিজাম মৃধা বলেন, এখানে বর্তমান চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করছেন। তার পক্ষে কাজ করছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা। যতদূর খবর পেয়েছি নির্বাচনের দিন তারা বেশ কয়েকটি কেন্দ্র দখল করে সিল মারার প্রস্তুতি নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে টেনশনে আছি এবং প্রশাসনকে জানিয়েছি। প্রশাসন কঠোর হলে হয়তো নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে।

বরিশালের হিজলা হরিনাথপুর, বড়জালিয়া ও মেমানিয়া ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের তিন প্রার্থীর অভিযোগ আবার স্থানীয় সংসদ সদস্য পঙ্কজ দেবনাথের বিরুদ্ধে। এ তিন ইউনিয়নেই দলীয় প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভোট যুদ্ধে নেমেছেন আওয়ামী লীগের তিন প্রভাবশালী নেতা। হরিনাথপুরের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল লতিফ খান বলেন, এমপি (পঙ্কজ) সরাসরি নৌকার বিরোধিতা করছেন। বড়জালিয়া ও মেমানিয়া ইউনিয়নের নৌকা প্রতীকের দুই প্রার্থী যথাক্রমে এনায়েত হোসেন হাওলাদার ও অলিউদ্দিন তালুকদার বলেন, সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে এখানে হেরেছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। জয়ী হওয়া বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন এমপি পঙ্কজ। তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে এমপি পঙ্কজ দেবনাথ বলেন, আমার রক্ত-মাংসে নৌকা। দলের বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তারা যা বলছেন তা ঠিক নয়। আমি নৌকার পক্ষেই কাজ করছি।

বিদ্রোহীদের হাত থেকে নৌকাকে বাঁচাতে নানা চেষ্টা চলছে। প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে বিদ্রোহীদের সরাতে নানা চেষ্টা চালিয়েছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। দফায় দফায় হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দিয়েছেন তারা।

জেলা আওয়ামী লীগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থীরা হলেন- হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পন্ডিত সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক সরদার, সাংগঠনিক সম্পাদক মাস্টার নাসির উদ্দিন হাওলাদার, হরিনাথপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুর রহমান সিকদার, মুলাদী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম মুন্সি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মজিবুর রহমান শরীফ, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ আলী, বানারীপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি তাজেম আলী হাওলাদার, বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নূরুল ইসলাম এবং চরবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম ওরফে ইতালি শহিদ।

এছাড়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করায় বহিষ্কৃতরা হলেন- বরিশাল জেলা কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনায়েত হোসেন পান্না, বাকেরগঞ্জের দাড়িয়াল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বাছের আহম্মেদ বাচ্চু, গারুরিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুদ্দিন তালুকদার মিন্টু, কলসকাঠি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সালাম তালুকদার, বাবুগঞ্জ উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম মীর, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা মনির খান, ইসমাইল বেপারী এবং একই ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি রব বেপারী।

জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। উত্তর যথাযথ না হলে স্থায়ীভাবে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে।

সোমবার বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ১৭৩টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। যদিও এরমধ্যে ২৬টি ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ৩১ জন ইউপি সদস্যও ভোট ছাড়াই জয়ী হয়েছেন।

Leave a comment