তাকওয়া অর্জন করতে না পারলে রোজা একেবারেই সারশূন্য।

মুসলমানদের ওপর রোজা ফরজ করার আসল উদ্দেশ্য কী সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সূরা আল-বাক্বারা: ১৮৩) অর্থাৎ তাকওয়ার শিক্ষা অর্জন করাটাই হল রোজার আসল উদ্দেশ্য। তাকওয়া অর্জন করতে না পারলে সিয়াম সাধনা একেবারেই সারশূন্য। পরিবারের সব সদস্য রোজা রাখছে একা একা রোজা না রাখলে খাবার সমস্যা, রোজা না রাখলে মানুষ খারাপ বলবে, মুরব্বিদের গালমন্দ শুনতে হবে, সবাই যখন রোজা রাখছে আমিও রাখি, রোজা রাখলে কিছু না হোক শরীরের কিছু উপকারতো হবেই ঈত্যাদি ভাবনা থেকে রোজা রাখলে কোনো লাভ নাই। তাকওয়া আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ভয় করা, আত্মরক্ষা করা, বেঁচে থাকা ঈত্যাদি। আর ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় তাকওয়া বলতে আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য সমস্ত প্রকার পাপাচার থেকে আত্মরক্ষা করাকে বোঝায়। তাকওয়া হলো মুমিনের আত্মার এমন এক শক্তি যা তাকে সর্বদা আল্লাহর ভয়ে ভীত রাখে। সে সদা সর্বদা এই ভয়ে ভীত থাকে যে জীবনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কোনো কাজেও যদি আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হয় তা হলেও কিয়ামতের দিন সেজন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।

তাই মুমিন ব্যক্তি সব সময় নিজের আত্মার বাধ্যবাধকতায় নিজ জীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ড খোদায়ি বিধানের আলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। অতএব বলা যায় তাকওয়ার অর্থ হলো, জীবনকে আত্মনিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।

পাপ প্রবণতা মানুষের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য। ফেরেস্তাদের মধ্যে পাপ করার যোগ্যতাই নাই। তাই তারা কিয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘ হায়াত পাবার পরেও কোন পাপাচারে করতে পারে না।

বিপরীতে মানুষের মধ্যে রয়েছে তার নাফ্স, যা তাকে সব সময় পাপাচারের দিকে আকৃষ্ট করে। আর বিতাড়িত শয়তান মানুষকে মহান আল্লাহর অবাধ্যতার পথে ধাবিত করতে পণ করেই পৃথিবীতে এসেছে। সুতরাং মানুষ পাপ করবে সেটাই স্বাভাবিক। পাপ করার পরে মানুষ অনুতপ্ত হবে, নিজের পাপের জন্য মহান আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বিনীত বান্দার সব পাপ মাফ করবেন, তার আমলনামায় পাপের জায়গাটা পূন্য দিয়ে ভরে দেবেন। মানুষ ফেরেস্তার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান হওয়ার আসল কারণ এটাই। আর মুমিন বান্দার পাপ থেকে মুক্তি লাভের মহান সুযোগ নিয়ে প্রতি বছর একবার করে আসে মাহে রমজান। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন রমজান মাস আরম্ভ হয়, তখন শয়তান ও দুষ্টুপ্রকৃতির জীনদের বন্দি করে রাখা হয়, আর জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। অতঃপর তার একটি দরজাও আর খোলা হয় না এবং জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। অতঃপর তার একটি দরজাও আর বন্ধ করা হয় না। আর একজন ঘোষক অনবরত ঘোষণা করতে থাকে, হে সৎকর্মপরায়ন! তুমি দ্রুত অগ্রসর হও। আর হে পাপাচারি! তুমি নিবৃত হও। আর মহান আল্লাহ বহু জাহান্নামিকে মুক্তি দান করেন। আর এটা রমজানের প্রত্যেক রাতেই করা হয়। (সুনানে তিরমিযী, হাদীস: ৬৮২, সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস: ১৮৮৩, সহীহ ইবনে হিব্বান, খণ্ড: ৮, হাদীস: ২২২, সুনানে ইবনে মাযা, হাদীস: ১৬৪২,  মুসনাদে আহমদ, খণ্ড: ১২, হাদীস: ৬০) তাই রমজানের একমাস পাপ-পঙ্কিলতা আর অপরাধ প্রবণতা থেকে মুক্ত থাকার বিশেষ অনুশীলন ‘সিয়াম সাধনা’ আমাদের সমজটাকে পাপাচার মুক্ত করবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: পেশ ইমাম, রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীয় মসজিদ।

Facebook Comments